অযৌন জনন (Asexual
Reproduction): প্রথমেই জেনে রাখা
ভালো, অযৌন জনন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে নতুন চারা
বা জীব তৈরি হতে বাবা-মা দুজনের দরকার হয় না, যেকোনো একজন
থেকেই হুবহু নতুন একটি প্রাণ তৈরি হয়ে যায়।
১. স্পোর উৎপাদন (Spore
Formation)
স্পোর হলো খুব ছোট্ট, ধুলোর মতো এক ধরনের কণা। কিছু উদ্ভিদ (যেমন- ফার্ন বা মাশরুম) বীজ তৈরি
করতে পারে না। তার বদলে তারা এই স্পোর তৈরি করে। এই স্পোরগুলো বাতাসে উড়ে গিয়ে
মাটিতে পড়লে সেখান থেকে নতুন গাছের জন্ম হয়। ঠিক যেন জাদুর ধুলো!
২. অণুবীজবাহী অঙ্গ (Sporangium)
স্পোরগুলো তো আর এমনি এমনি গাছের গায়ে লেগে থাকে না,
এগুলো একটা ছোট্ট থলে বা বাক্সের ভেতর জমা থাকে। গাছের যে অংশটি
বা থলেটি এই স্পোরগুলোকে সযত্নে নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখে, তাকেই
অণুবীজবাহী অঙ্গ বা স্পোরাঞ্জিয়াম বলে।
৩. বহিঃঅণুবীজ বা কনিডিয়াম (Conidium)
সব স্পোর যে থলের ভেতরে জন্মায় তা কিন্তু নয়! কিছু
ফাঙ্গাস বা ছত্রাক আছে, যাদের স্পোর থলের
ভেতর না থেকে শাখার একদম বাইরের দিকে শেকলের মতো ঝুলতে থাকে। শরীরের বাইরে তৈরি
হওয়া এই স্পোরগুলোকেই বলা হয় বহিঃঅণুবীজ বা কনিডিয়াম (যেমন: পেনিসিলিয়াম)।
৪. অঙ্গজ জনন (Vegetative
Reproduction)
বীজ ছাড়া গাছের যেকোনো অঙ্গ (যেমন: মূল,
কাণ্ড বা পাতা) থেকে যখন নতুন গাছ জন্মায়, তাকে অঙ্গজ জনন বলে। ধরো, তুমি একটি পাথরকুচি
পাতা মাটিতে ফেলে রাখলে, কিছুদিন পর দেখলে পাতার কিনারা
থেকে নতুন চারা গজাচ্ছে—এটাই অঙ্গজ জনন!
৫. প্রজনন (Reproduction)
এটি হলো সেই সাধারণ প্রক্রিয়া,
যার মাধ্যমে যেকোনো জীব তার নিজের মতো নতুন একটি প্রাণী বা
উদ্ভিদ জন্ম দেয়, যাতে তাদের বংশ পৃথিবীতে টিকে থাকে। এটি
যৌন বা অযৌন—যেকোনো রকম হতে পারে।
৬. প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন (Natural
Vegetative Reproduction)
যখন মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই প্রকৃতিতে নিজে থেকেই
গাছের ডাল, মূল বা পাতা থেকে নতুন গাছ জন্মায়,
তখন তাকে প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন বলে। যেমন- মিষ্টি আলুর শিকড় থেকে
নতুন গাছ গজানো।
৭. রূপান্তরিত কাণ্ড / পরিবর্তিত
কাণ্ড (Modified Stem)
সাধারণত গাছের কাণ্ড মাটির ওপরে থাকে। কিন্তু কিছু গাছের
কাণ্ড খাবার জমিয়ে রাখার জন্য বা নতুন গাছ তৈরির জন্য তাদের রূপ বা আকার বদলে
ফেলে। অনেক সময় এরা মাটির নিচেও লুকিয়ে থাকে!
৯. রাইজোম (Rhizome)
এটি এক ধরনের রূপান্তরিত কাণ্ড,
যা মাটির নিচে সমান্তরালভাবে বা শুয়ে শুয়ে বাড়ে। এর গায়ে ছোট ছোট
গিট বা পর্ব থাকে। আদা বা হলুদ হলো রাইজোমের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। আদার গিটগুলো
থেকে সহজেই নতুন চারা বের হতে পারে।
১০. কন্দ (Bulb/Tuber)
কন্দ হলো এমন কাণ্ড যা খাবার জমিয়ে রেখে একদম গোলগাল বা
রসালো হয়ে যায়। যেমন- গোল আলু (স্ফীতকন্দ) বা পেঁয়াজ। আলুর গায়ে যে ছোট ছোট 'চোখ' থাকে, সেগুলো
মাটিতে পুঁতে দিলে নতুন আলুগাছ জন্মায়।
১১. স্টোলন বা ধাবক (Stolon/Runner)
কিছু গাছের কাণ্ড খুব দুর্বল হয়। এরা মাটির ওপর দিয়ে
লতিয়ে লতিয়ে সামনের দিকে এগোয়। মাটির সাথে যেখানেই এদের কাণ্ডের গিট ছোঁয়া লাগে,
সেখান থেকেই শিকড় গজিয়ে নতুন গাছ তৈরি হয়। পুদিনা পাতা, থানকুনি বা স্ট্রবেরি হলো এর দারুণ উদাহরণ।
১২. অফসেট (Offset)
অফসেট হলো স্টোলনের মতোই,
তবে এটি ডাঙায় নয়, পানিতে থাকে!
কচুরিপানা বা টোপাপানার মতো জলজ উদ্ভিদের কাণ্ড যখন একটু মোটা আর খাটো হয়ে পাশ
দিয়ে বেড়ে নতুন চারা তৈরি করে, তখন তাকে অফসেট বলে।
১৩. বুলবিল (Bulbil)
মাঝে মাঝে কিছু গাছের কাণ্ডের কুঁড়ি খাবার জমিয়ে রেখে
ছোট গোল আলুর মতো মাংসল আকার ধারণ করে। গাছ থেকে এই গোল অংশটি (বুলবিল) মাটিতে খসে
পড়লেই সেখান থেকে নতুন গাছ জন্মায়। চুপড়ি আলু বা মেটে আলুতে এটি দেখা যায়।
১৪. কৃত্রিম অঙ্গজ জনন (Artificial
Vegetative Reproduction)
প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনে গাছের
ডাল বা কাণ্ড কেটে বা জোড়া লাগিয়ে নতুন গাছ তৈরি করে,
তখন তাকে কৃত্রিম অঙ্গজ জনন বলে। আমরা নার্সারিতে যে চারাগুলো
দেখি, তার অনেকগুলোই এভাবে তৈরি।
১৫. কলম (Grafting/Layering)
কৃত্রিমভাবে গাছের বংশবৃদ্ধি করার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায়
হলো কলম করা। ভালো জাতের ফল বা ফুল পাওয়ার জন্য গাছের ডাল বা শাখা ব্যবহার করে এই
পদ্ধতিতে নতুন গাছ তৈরি করা হয়।
১৬. শাখা কলম (Stem
Cutting)
এটি কলম করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। একটি স্বাস্থ্যবান
গাছের ডাল বা শাখা কেটে যদি মাটিতে বা ভেজা বালিতে পুঁতে দেওয়া হয়,
তবে কিছুদিন পর সেই ডাল থেকে শিকড় গজিয়ে নতুন গাছ হয়ে যায়। গোলাপ
বা জবা গাছের চারা আমরা এভাবেই তৈরি করি!
আগের পর্বের মতো চলো এবার আমরা গাছের 'যৌন জনন' বা ফুল থেকে কীভাবে বীজ ও ফল তৈরি হয়,
তা সহজভাবে জেনে নিই।
যৌন জনন (Sexual
Reproduction): এই প্রক্রিয়ায়
নতুন গাছ তৈরির জন্য বাবা ও মা—দুটো ভিন্ন অংশের দরকার হয়। গাছের ক্ষেত্রে এই
কাজটিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ফুল!
১। অপুষ্পক ও সপুষ্পক উদ্ভিদ
- অপুষ্পক উদ্ভিদ: নাম
শুনেই বোঝা যাচ্ছে, যেসব গাছে কখনোই ফুল ফোটে
না, তাদের অপুষ্পক উদ্ভিদ বলে। যেমন- ফার্ন বা
শ্যাওলা। এরা স্পোর দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে।
- সপুষ্পক উদ্ভিদ: যেসব
গাছে সুন্দর সুন্দর ফুল ফোটে, তাদের সপুষ্পক উদ্ভিদ বলে। যেমন- আম, জাম,
গোলাপ, জবা।
২। সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ফুল
- সম্পূর্ণ ফুল: একটি
আদর্শ ফুলের ৪টি প্রধান অংশ থাকে—বৃতি, পাঁপড়ি, পুরুষ অংশ এবং স্ত্রী অংশ। যে
ফুলে এই ৪টি অংশই থাকে, তাকে সম্পূর্ণ ফুল বলে
(যেমন- জবা ফুল)।
- অসম্পূর্ণ ফুল: ফুলের এই
৪টি অংশের কোনো একটি যদি বাদ পড়ে যায়, তবে তাকে অসম্পূর্ণ ফুল বলে (যেমন- লাউ ফুল বা কুমড়ো ফুল)।
৩। বৃতি ও উপবৃতি
- বৃতি: ফুল যখন
ছোট্ট কুঁড়ি থাকে, তখন খেয়াল করেছ তার
চারপাশে সবুজ পাতার মতো একটা ঢাকনা থাকে? এটাই বৃতি।
এটি রোদ-বৃষ্টি থেকে কুঁড়িকে বাঁচায়।
- উপবৃতি: জবা
ফুলের বোঁটার ঠিক ওপরে, আসল বৃতির
নিচে আরও ছোট ছোট কিছু সবুজ পাতার মতো অংশ থাকে, এদের
উপবৃতি বলে।
৪। বৃন্ত
বৃন্ত মানে হলো ফুলের বোঁটা। এই বোঁটা দিয়েই ফুলটি গাছের
ডালের সাথে শক্ত করে আটকে থাকে।
৫। সবৃন্তক ও অবৃন্তক ফুল
- সবৃন্তক ফুল: যেসব
ফুলের বোঁটা বা বৃন্ত থাকে, তাদের
সবৃন্তক ফুল বলে। গোলাপ, জবা—এদের সবার বোঁটা আছে।
- অবৃন্তক ফুল: যেসব
ফুলের কোনো বোঁটা থাকে না, ডালের সাথে
একদম লেপ্টে থাকে, তাদের অবৃন্তক ফুল বলে। যেমন-
রজনীগন্ধা বা হাতিশুঁড় ফুল।
৬। বিযুক্ত বৃতি
ফুলের নিচের দিকের সবুজ অংশগুলো (বৃতি) যদি একে অপরের
সাথে আঠার মতো লেগে না থেকে আলাদা আলাদা থাকে, তখন তাকে বিযুক্ত বৃতি বলে।
৭। দলমন্ডল
ফুলের সবচেয়ে সুন্দর, রঙিন ও সুগন্ধি অংশটি হলো তার পাঁপড়িগুলো। একটি ফুলের সবগুলো পাঁপড়িকে
একসাথে মিলিয়ে বলা হয় দলমণ্ডল। এর রঙ দেখেই তো প্রজাপতি আর মৌমাছিরা ছুটে আসে!
৮। পুংস্তবক ও পুংকেশর
এটি হলো ফুলের পুরুষ অংশ। ফুলের পাঁপড়ির ভেতর লম্বা
লম্বা সুতোর মতো যে অংশগুলো দেখা যায়, সেগুলো মিলে তৈরি হয় পুংস্তবক। আর এর একেকটি সুতোকে বলা হয় পুংকেশর।
৯। পুংদন্ড ও পরাগধানী
- পুংদণ্ড: পুংকেশরের
যে অংশটি লম্বা নলের মতো, তাকে
পুংদণ্ড বলে।
- পরাগধানী: পুংদণ্ডের
ঠিক মাথায় একটি ছোট থলির মতো অংশ থাকে, যার ভেতর হলুদ রঙের গুঁড়ো বা পরাগরেণু থাকে। একেই পরাগধানী বলে।
১০। গ্যামেট
গ্যামেট হলো জনন কোষ বা নতুন প্রাণ তৈরির মূল উপাদান।
পুরুষ গ্যামেট (পরাগরেণু থেকে আসে) আর স্ত্রী গ্যামেট (ডিম্বকের ভেতর থাকে) একসাথে
মিললেই একটি নতুন বীজের জন্ম হয়।
১১। স্ত্রীস্তবক ও গর্ভকেশর
এটি হলো ফুলের স্ত্রী অংশ। এটি একদম ফুলের মাঝখানে থাকে।
স্ত্রীস্তবকের এক বা একাধিক অংশকে গর্ভকেশর বলে। এর ভেতরেই মূলত ফল আর বীজ বড়
হওয়ার জাদুটি ঘটে!
১২। যুক্তগর্ভপত্রী ও বিযুক্ত
গর্ভপত্রী
- যুক্তগর্ভপত্রী: যখন
ফুলের গর্ভকেশরগুলো একসাথে জোড়া লেগে থাকে, তখন তাকে যুক্তগর্ভপত্রী বলে (যেমন- ধুতুরা)।
- বিযুক্ত গর্ভপত্রী: আর যখন
এগুলো আলাদা আলাদা ছড়ানো থাকে, তখন তাকে বিযুক্ত গর্ভপত্রী বলে (যেমন- গোলাপ)।
১৩। গর্ভাশয়,
গর্ভদন্ড ও গর্ভমুন্ড
একটি গর্ভকেশরের ৩টি অংশ থাকে:
- গর্ভমুণ্ড: একদম
উপরের মাথার অংশ, যেখানে উড়ে আসা পরাগরেণু
আঠার মতো আটকে যায়।
- গর্ভদণ্ড: মাঝখানের
সরু লম্বা নলের মতো গলা।
- গর্ভাশয়: একদম
নিচের দিকে ফুলে থাকা অংশ। এটিই পরে বড় হয়ে মজাদার 'ফল' তৈরি করে!
১৪। ডিম্বক
গর্ভাশয়ের ভেতরে ছোট ছোট দানার মতো কিছু জিনিস থাকে,
এদের ডিম্বক বলে। এই ডিম্বকগুলোই বড় হয়ে 'বীজ' তৈরি করে। ফলের ভেতর আমরা যে বীজ দেখি,
সেগুলো আগে ডিম্বক ছিল।
১৫। থ্যালামাস ও পুষ্পপত্রাধার
ফুলের বোঁটার ঠিক মাথায় একটু চওড়া বা ফুলে ওঠা একটি অংশ
থাকে, যার ওপরে ফুলের বৃতি, পাঁপড়ি সব সুন্দর করে সাজানো থাকে। এই বসার জায়গাটিকেই থ্যালামাস বা
পুষ্পপত্রাধার (বা পুষ্পাক্ষ) বলে।
১৬। পুষ্পমঞ্জরি
অনেক সময় গাছে একটা-দুটো ফুল না ফুটে একটা আস্ত ডালজুড়ে
অনেক ফুল একটা নিয়মে সাজানো থাকে। এই ফুলসহ ডালটিকেই পুষ্পমঞ্জরি বা Inflorescence
বলে।
১৭। অনিয়ত পুষ্পমঞ্জরি ও নিয়ত
পুষ্পমঞ্জরি
- অনিয়ত পুষ্পমঞ্জরি: এই ধরনের
ফুলে ডালটি লম্বা হতেই থাকে আর নিচ থেকে ওপরের দিকে নতুন নতুন ফুল ফুটতেই
থাকে। ডালের বৃদ্ধি থামে না (যেমন- সরিষা বা রজনীগন্ধা)।
- নিয়ত পুষ্পমঞ্জরি: এই ধরনের
ডালে একদম মাথায় একটি ফুল ফুটে যায়, যার ফলে ডালটি আর লম্বা হতে পারে না। বৃদ্ধি ওখানেই থেমে যায়
(যেমন- জবা বা বেলি)।
১। পরাগায়ন (Pollination)
ফুলের পুংকেশরের মাথায় থাকা পরাগরেণু যখন উড়ে গিয়ে বা
কারও সাহায্যে একই ফুল বা অন্য কোনো ফুলের গর্ভমুণ্ডে গিয়ে পড়ে,
সেই ঘটনাকেই পরাগায়ন বলে। সহজ কথায়, এটি
হলো ফুলের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় 'পরাগ' বা রেণুর ভ্রমণ! এই ভ্রমণের ফলেই কিন্তু গাছে ফল আর বীজ হয়। পরাগায়ন না
হলে আমরা মজার মজার ফলগুলো পেতাম না!
২। স্বপরাগায়ন ও পরপরাগায়ন (Self-pollination
and Cross-pollination)
পরাগরেণুর এই ভ্রমণ মূলত দুইভাবে হতে পারে:
- স্বপরাগায়ন (Self-pollination): পরাগরেণু যখন একই ফুলের ভেতর অথবা একই গাছের অন্য
একটি ফুলের ওপর পড়ে, তখন তাকে স্বপরাগায়ন বলে।
ব্যাপারটি অনেকটা নিজের ঘরের ভেতর এক রুম থেকে অন্য রুমে যাওয়ার মতো! (যেমন-
শিম, টমেটো, সরিষা)।
- পরপরাগায়ন (Cross-pollination): পরাগরেণু যখন উড়ে বা কোনো বাহকের মাধ্যমে একই জাতের
কিন্তু দূরের অন্য একটি গাছের ফুলে গিয়ে পড়ে, তখন
তাকে পরপরাগায়ন বলে। এটি হলো দূরের কোনো বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মতো!
(যেমন- পেঁপে, শিমুল)।
৩। পরাগরেণু (Pollen
grain)
তুমি কি কখনো জবা, সরিষা বা গাঁদা ফুলের মাঝখানে হাত দিয়েছ? দেখবে
হাতে হলুদ বা কমলা রঙের একধরনের মিহি গুঁড়ো লেগে যায়। এই ছোট ছোট গুঁড়োগুলোই হলো
পরাগরেণু! এগুলো দেখতে পাউডারের মতো ছোট হলেও, নতুন গাছ
তৈরির জন্য এগুলো সবচেয়ে বেশি দরকারি।
৪। অভিযোজন (Adaptation)
পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বাঁচার জন্য বা কোনো বিশেষ কাজ
ভালোভাবে করার জন্য গাছপালা যখন নিজেদের চেহারায় বা স্বভাবে একটু পরিবর্তন আনে,
তাকে অভিযোজন বলে। যেমন, পোকামাকড়কে
ডাকার জন্য কিছু ফুল নিজেদের খুব সুন্দর রঙিন করে সাজায়, আবার
কিছু ফুলে অনেক মিষ্টি মধু জমা করে রাখে। ফুলেরা যে পরাগায়নের সুবিধার জন্য
নিজেদের এভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছে, এটাই ফুলের
পরাগায়ন-বিষয়ক অভিযোজন!
৫। পতঙ্গপরাগী, বায়ুপরাগী, পানিপরাগী ও প্রাণীপরাগী ফুল
পরাগরেণুর তো আর পা নেই যে হেঁটে হেঁটে অন্য ফুলে যাবে!
তাই তাদের কিছু বন্ধু দরকার হয়, যারা তাদের
বয়ে নিয়ে যায়। এই বন্ধুদের ওপর ভিত্তি করে ফুলদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- পতঙ্গপরাগী ফুল (Insect-pollinated): যে ফুলগুলোতে মৌমাছি, প্রজাপতি বা অন্য
পোকারা বসে পরাগায়ন ঘটায়। এদের রং খুব উজ্জ্বল হয় এবং মিষ্টি গন্ধ বা মধু
থাকে, যা পোকাদের আকৃষ্ট করে। যেমন- জবা, সরিষা, গোলাপ।
- বায়ুপরাগী ফুল (Wind-pollinated): এই ফুলগুলোর রেণু বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। এদের খুব একটা রং বা গন্ধ
থাকে না, তবে পরাগরেণুগুলো খুব হালকা হয় যেন বাতাসে
সহজে ভাসতে পারে। যেমন- ধান, গম, ভুট্টা।
- পানিপরাগী ফুল (Water-pollinated): যেসব উদ্ভিদ পানিতে থাকে, তাদের পরাগরেণু
পানির স্রোতে ভেসে অন্য ফুলে পৌঁছায়। যেমন- পাতাশ্যাওলা বা ভ্যালিসনেরিয়া।
- প্রাণীপরাগী ফুল (Animal-pollinated): যখন কোনো বড় প্রাণী, যেমন- ছোট পাখি,
বাদুড় বা এমনকি শামুক পরাগায়ন ঘটায়। এই ফুলগুলো সাধারণত
আকারে একটু বড় হয় যেন প্রাণীরা সহজেই দেখতে পায়। যেমন- কদম, শিমুল, কচু।
১। নিষিক্তকরণ (Fertilization)
পরাগায়নের সময় যে পরাগরেণু উড়ে এসে ফুলের মাথায় বসে,
তার ভেতরে থাকে পুং-গ্যামেট (ছেলে অংশ)। আর ফুলের একদম নিচে
গর্ভাশয়ের ভেতরে থাকে স্ত্রী-গ্যামেট বা ডিম্বক (মেয়ে অংশ)। এই পুং-গ্যামেট আর
স্ত্রী-গ্যামেট যখন একে অপরের সাথে মিলে যায়, সেই জাদুকরী
মিলনকেই বলে নিষিক্তকরণ। এই নিষিক্তকরণ হওয়ার পরই ফুল ঝরে যায় আর সেখানে ফল বড় হতে
শুরু করে!
২। পরাগনালি (Pollen
tube)
পরাগায়নের পর পরাগরেণু যখন ফুলের মাথার ওপর (গর্ভমুণ্ডে)
বসে, তখন সে বসে বসে একটু রস শুষে নেয়।
এরপর সেখান থেকে একটা ছোট্ট লম্বা সুড়ঙ্গ বা পাইপ তৈরি করে সে নিচের দিকে নামতে
থাকে। এই পাইপটাকেই পরাগনালি বলে। এই পাইপ বা নলের ভেতর দিয়েই পরাগরেণুর ভেতরের
পুং-গ্যামেটগুলো স্লাইডে চড়ে নিচে নামার মতো সোজা ডিম্বকের কাছে পৌঁছে যায়।
৩। সরল ফল (Simple fruit)
যখন একটি ফুলের একটামাত্র গর্ভাশয় (ফুলের একদম নিচের
ফোলা অংশ) বড় হয়ে একটাই ফল তৈরি করে, তখন তাকে সরল ফল বলে। আমরা প্রতিদিন যে ফলগুলো খাই, তার বেশিরভাগই সরল ফল। যেমন- আম, জাম, কলা বা লিচু।
৪। রসাল ফল ও নীরস ফল (Fleshy
fruit and Dry fruit)
সরল ফল আবার দুই রকমের হতে পারে:
- রসাল ফল: যে
ফলগুলো পাকলে ভেতরটা রসে টইটম্বুর হয়ে যায়, অনেক মাংসল হয় আর ফলের চামড়া বা খোসা নরম থাকে, তাদের রসাল ফল বলে। এই ফলগুলো পাকলে নিজে নিজে ফেটে যায় না। যেমন-
আম, জাম, পেঁপে, তরমুজ।
- নীরস ফল: যে
ফলগুলো পাকলে ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় আর খোসাটা পাতলা ও শক্ত হয়ে যায়, তাদের নীরস ফল বলে। এগুলো পাকলে অনেক সময় নিজে
নিজেই ফেটে গিয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। যেমন- মটরশুঁটি, শিম,
ঢ্যাঁড়স বা সর্ষে।
৫। গুচ্ছ ফল (Aggregate
fruit)
মাঝে মাঝে একটি ফুলের ভেতরে অনেকগুলো আলাদা আলাদা
গর্ভাশয় থাকে। এগুলো বড় হয়ে যখন একসাথে গাদাগাদি করে একটি বোঁটার ওপর গুচ্ছ বা
ঝোপার মতো ফল তৈরি করে, তখন তাকে গুচ্ছ
ফল বলে। যেমন- আতাফল বা স্ট্রবেরি। একটি আতাফল ভাঙলে দেখবে ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট
ফলের টুকরো একসাথে জোড়া লেগে আছে!
৬। যৌগিক ফল (Multiple
fruit)
এটি খুব মজার একটি বিষয়! যখন একটি আস্ত ডালের অনেকগুলো
ফুল (পুষ্পমঞ্জরি) একসাথে মিলেমিশে একটামাত্র বড় ফল তৈরি করে ফেলে,
তখন তাকে যৌগিক ফল বলে। যেমন- কাঁঠাল বা আনারস। একটি বিশাল
কাঁঠালের ভেতরে যে এতগুলো রসালো কোষ থাকে, তার একেকটি কোষ
কিন্তু একেকটি আলাদা ফুল থেকে তৈরি হয়েছে!
১। অঙ্কুরোদগম (Germination)
বীজ সাধারণত মাটিতে ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু যখন সে পর্যাপ্ত
পানি, বাতাস আর তাপ (উষ্ণতা) পায়, তখন তার ঘুম ভেঙে যায় এবং ভেতর থেকে ছোট্ট চারাগাছ বেরিয়ে আসে। বীজ
থেকে এই নতুন শিশু গাছ জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলে অঙ্কুরোদগম।
২। মাইক্রোপাইল / ডিম্বকরন্ধ্র (Micropyle)
বীজের গায়ে খুব ছোট্ট একটা ছিদ্র থাকে,
যাকে মাইক্রোপাইল বা ডিম্বকরন্ধ্র বলে। এটা অনেকটা বীজের মুখের
মতো কাজ করে। তুমি যদি একটা ভেজানো ছোলা বা বুট নিয়ে হালকা চাপ দাও, দেখবে ওই ছোট্ট ফুটোটা দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে! অঙ্কুরোদগমের সময় বীজ এই
ছিদ্র দিয়েই পানি পান করে ফুলে ওঠে।
৩। ভ্রূণমূল ও ভ্রূণকাণ্ড (Radicle
and Plumule)
বীজের ভেতরে যে ছোট্ট ঘুমন্ত গাছটি থাকে,
তাকে বলে ভ্রূণ। এই ভ্রূণের দুটো প্রধান অংশ থাকে:
- ভ্রূণমূল (Radicle): অঙ্কুরোদগমের সময় ভ্রূণের যে অংশটি নিচের দিকে
অর্থাৎ মাটির গভীরে চলে যায় এবং গাছের শিকড় বা মূল তৈরি করে, তাকে ভ্রূণমূল বলে।
- ভ্রূণকাণ্ড (Plumule): আর যে অংশটি আলোর খোঁজে মাটির ওপরে উঠে আসে এবং
গাছের কাণ্ড ও পাতা তৈরি করে, তাকে বলে ভ্রূণকাণ্ড।
৪। বীজপত্রাধিকাণ্ড ও বীজপত্রাবকাণ্ড (Epicotyl
and Hypocotyl)
- বীজপত্রাধিকাণ্ড (Epicotyl): চারাগাছের ভ্রূণকাণ্ড এবং বীজপত্র (বীজের যে পাতা
থাকে) এর মাঝখানের অংশটিকে বীজপত্রাধিকাণ্ড বলে। এটি উপরের দিকের অংশ।
- বীজপত্রাবকাণ্ড (Hypocotyl): ভ্রূণমূল এবং বীজপত্রের মাঝখানের অংশটিকে
বীজপত্রাবকাণ্ড বলে। এটি নিচের দিকের অংশ, যা শিকড়ের
কাছাকাছি থাকে।
৫। টেস্টা ও টেগমেন (Testa
and Tegmen)
বীজের বাইরের আবরণ বা খোসাকে বীজত্বক বলে। এটি মূলত
বীজের জামাকাপড়! এই বীজত্বকের দুটো স্তর থাকে:
- টেস্টা (Testa): বাইরের শক্ত এবং পুরু স্তরটিকে টেস্টা বলে, যা বীজকে বাইরের আঘাত থেকে বাঁচায়।
- টেগমেন (Tegmen): ভেতরের দিকের একদম পাতলা পর্দার মতো নরম স্তরটিকে
টেগমেন বলে।
৬। মৃৎগত ও মৃৎভেদী অঙ্কুরোদগম (Hypogeal
and Epigeal Germination)
চারা গজানোর সময় বীজপত্র কোথায় থাকছে,
তার ওপর ভিত্তি করে অঙ্কুরোদগম দুই রকম হয়:
- মৃৎগত অঙ্কুরোদগম (Hypogeal): 'মৃৎ' মানে মাটি আর 'গত' মানে ভেতরে। যে অঙ্কুরোদগমে বীজপত্র
মাটির নিচেই থেকে যায়, শুধু ভ্রূণকাণ্ডটি মাটি ফুঁড়ে
ওপরে উঠে আসে, তাকে মৃৎগত অঙ্কুরোদগম বলে। যেমন-
ছোলা, আম, কাঁঠাল।
- মৃৎভেদী অঙ্কুরোদগম (Epigeal): 'ভেদী' মানে ভেদ করে
বেরিয়ে আসা। যে অঙ্কুরোদগমে চারা গজানোর সময় বীজপত্রসহ পুরো বীজটাই মাটি
ফুঁড়ে ওপরে উঠে আসে, তাকে মৃৎভেদী অঙ্কুরোদগম বলে।
যেমন- কুমড়ো, তেঁতুল, রেড়ি,
লাউ।
৭। অশস্যল দ্বিবীজপত্রী বীজ (Non-endospermic
dicotyledonous seed)
নামটা একটু বড় হলেও বোঝা খুব সোজা!
- দ্বিবীজপত্রী: যে বীজের
খোসা ছড়ালে দুটো সমান ডালের মতো অংশ পাওয়া যায়, তাকে দ্বিবীজপত্রী বলে (যেমন- ছোলা বা শিম)। এই দুটো অংশই হলো
বীজপত্র।
- অশস্যল: বীজের
ভেতরে ভ্রূণটি বড় হওয়ার সময় যদি আলাদা করে জমানো কোনো খাবার (শস্য) না থাকে, তবে তাকে অশস্যল বীজ বলে। এই বীজগুলোতে সব খাবার
ওই দুটো মোটা বীজপত্রের ভেতরেই জমা থাকে।
তাই ছোলার মতো যে বীজগুলো দুই ভাগে ভাগ হয় এবং ভেতরে
আলাদা কোনো শস্য থাকে না, তাদের 'অশস্যল দ্বিবীজপত্রী বীজ' বলে।
0 মন্তব্যসমূহ